মৌচাকের আশেপাশে মৃত মৌমাছি খুঁজে পাওয়া যায় না কেন?

Undertaker Bees, Dead Honeybee, Why we don't see any dead bees near hive,

মৌমাছি একটি সামাজিক জীব। যুগ যুগ ধরেই মৌমাছির আচরণ, কাজকর্ম মানুষকে ভাবতে বাধ্য করেছে। পরিবেশের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই প্রাণিটি নিজেদের মধ্যে কলোনী গঠন করে বসবাস করে, যাকে আমরা মৌচাক বলে থাকি। 

সুন্দরভাবে দায়িত্ব বণ্টন, আর সেই দায়িত্ব নিষ্ঠার সাথে পালনের জন্য মৌমাছির জুড়ি মেলা ভার। চাক নির্মাণ, সুরক্ষা, মধু প্রক্রিয়াজাতকরণ, চাকের পরিচ্ছন্নতা রক্ষা এসব বিভিন্ন কাজের মধ্যে আরেকটা গুরুত্বপূর্ণ কাজ হচ্ছে মৃতদেহ সরানো, যার জন্য দায়িত্বও বণ্টন করা থাকে।

আমরা জানি, মৌমাছিদের জীবনকাল খুবই কম (১৪ থেকে ২৮ দিন প্রায়) এবং এক একটি মৌচাকে কয়েক হাজার মৌমাছি থাকে। সুতরাং একটি নির্দিষ্ট সময়ে একসঙ্গে অনেকগুলো মৌমাছি মারা যেতে পারে।

কিন্তু, কখনো খেয়াল করলে দেখবেন, মৌচাকের আশেপাশে মৃত মৌমাছি খুঁজে পাওয়া যায় না ( যদি না কোনো দুর্ঘটনা বা রোগ দেখা দেয় )। তাহলে মৌমাছিগুলো কোথায় যায়? মৌচাকের ভেতরেই থাকে? নাকি নিচে পড়ার পর কোনো প্রাণী সেগুলোকে খেয়ে ফেলে? মৌমাছিদের উধাও হয়ে যাওয়ার এই রহস্য নিয়েই আজকে আলোচনা করবো।

একটি মৌচাকের মোটামুটি ১ - ২ শতাংশ মৌমাছি মৃত
দেহ সরানোর কাজে নিয়োজিত। এদের বেশ সুন্দর একটি নাম আছে। এদের বলা হয় 'Undertaker bees'। ১২-১৭ দিন বয়সী কর্মী মৌমাছিরাই মূলত এই দলের অন্তর্ভুক্ত।

দায়িত্বপ্রাপ্ত এই আন্ডারটেকার মৌমাছি রা ৩০ মিনিটের মধ্যে অন্ধকার মৌচাক থেকে মৃত মৌমাছি সনাক্ত করে সেটিকে তুলে নিয়ে মৌচাক থেকে দূরে কোথাও ফেলে আসে। মৃতদেহ তুলতেও কিন্তু কম সংগ্রাম করতে হয় না! ১৫-২০ মিনিট ধরে চেষ্টা করে এই কাজ করতে সমর্থ হয় তারা।

একটি আন্ডারটেকার মৌমাছি মৃত মৌমাছিকে চাক থেকে দূরে নেয়ার চেষ্টা করছে

একটি মৌচাকের ১২ থেকে ১৭ দিন বয়সী সব মৌমাছি কী মৃতদেহ সৎকারের দায়িত্ব পালন করে? নাকি নির্দিষ্ট কিছু 
মৌমাছি? এটা বলা মুশকিল। 

তবে একই বয়সী অন্যান্য কর্মী মৌমাছিদের সাথে আন্ডারটেকার মৌমাছিদের কিছু পার্থক্য পরিলক্ষিত হয়। ১৭ দিন বয়সের অন্যান্য কর্মী মৌমাছিরা খাবার সংরক্ষণ, মৌচাক নির্মাণে বেশি সময় ব্যয় করলেও আন্ডারটেকার মৌমাছিরা এসব কাজে কম সময় ব্যয় করে। এদের বৃদ্ধিও অন্যদের থেকে কিছুটা দ্রুত।

কিন্তু, কোনো মৌমাছি মারা যাওয়ার বিষয়টি কীভাবে টের পায় তারা? বিষয়টি বেশ রহস্যজনক। কেননা, একটি চাকে হাজারো মৌমাছি থাকে। সেখান থেকে মৃত মৌমাছি খুঁজে বের করা সহজ কাজ নয়। এ কাজে ঘন্টার পর ঘন্টা সময় লাগার কথা।

চীনা পরিবেশবিদ পিং ওয়েনের একটা গবেষণাপত্র রয়েছে এ নিয়ে। সেখানে তিনি বলেছেন, জীবিত মৌমাছির শরীর থেকে কিউটিকুলার হাইড্রোকার্বন নামক কেমিক্যাল বেশ উচ্চ হারে নিঃসৃত হয়।

অন্যদিকে মৃত মৌমাছির শরীর থেকে কেমিক্যালের নিঃসরণ হার অনেক কম হয় এবং তাদের শরীরের তাপমাত্রা অনেক কমে যাবার জন্য এমনটা হতে পারে। 
ওয়েন মনে করেন, কিউটিকুলার হাইড্রোকার্বন নিঃসরণের পার্থক্য থেকেই মৃত মৌমাছি শনাক্ত হতে পারে বলে।


বিষয়টি সম্পর্কে আরো নিশ্চিত হওয়ার জন্য ওয়েন একটি পরিক্ষা করেন। ওয়েন মৃত মৌমাছি সংগ্রহ করে তাদের কিউটিকুলার হাইড্রোকার্বন হেক্সেন দিয়ে পরিষ্কার করেন। এরপর মৃত মৌমাছিটিকে তাপ প্রদানের মাধ্যমে জীবিত মৌমাছির দেহের তাপের অনুরুপ করে সেটিকে মৌচাকে রেখে দেন। 

দেখা গেল, আন্ডারটেকার মৌমাছিরা মৃত মৌমাছিটিকে আধ ঘন্টার মধ্যে মৌচাক থেকে দূরে সরিয়ে দিয়েছে। 

এর থেকে এটা নিশ্চিত হওয়া যায় যে, তাপমাত্রা নয় বরং সিএইচসি (কিউটিকুলার হাইড্রো কার্বন) এর অনুপস্থিতিই মৃত মৌমাছি সনাক্ত করতে সাহায্য করে।

চাকের আশেপাশে মৃত মৌমাছি না পাওয়ার পেছনে 
আরেকটি প্রচলিত মতামত রয়েছে।

বলা হয় যে, কিছু কিছু ক্ষেত্রে 'আয়ু শেষ হয়ে গেছে' এমনটা বুঝতে পেরে এরা নিজেরাই তখন মৌচাক ছেড়ে দূরে কোথাও চলে যায়। হয়তো সম্প্রদায়ের প্রতি প্রবল ভালোবাসা থেকে, চাকের নিরাপত্তার খাতিরে।

Post a Comment

0 Comments